Wednesday , January 17 2018
Home / তদন্ত প্রতিবেদন / অঢেল সম্পদের মালিক সাংসদ ওয়াদুদ

অঢেল সম্পদের মালিক সাংসদ ওয়াদুদ

রিপন রুদ্র: এবার চাকরি দেওয়ার নামে এলাকার অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর পুঠিয়া-দুর্গাপুর আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ এর বিরুদ্ধে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও বাসিন্দারা বলছেন, চাকরি আর টাকা—এ দুটোতে বুঁদ হয়ে পড়েছেন এই সংসদ সদ্য। গত ৫ বছরে তিনি চাকরি বাণিজ্য করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও জানা যায়।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ও বসিন্দারা জানান, বিগত ৯ বছরে পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০০ নিয়োগ হয়। যাতে সাংসদ ওয়াদুদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল। প্রতিটি নিয়োগের জন্য এই সাংসদ ৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত  নিয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এসব টাকার বেশির ভাগই লেনদেন হতো তার ভাই শরীফ কাজী, চাচা আলিউজ্জামান ও শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলীর মাধ্যমে। এছাড়া অনেক সময় সাংসদ নিজেও সরাসরিও টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চারজনই।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংসদ আবদুল ওয়াদুদ ‘সব সম্পূর্ণ মিথ্যা’ দাবি করে বলেন, তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। চাকরি দিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করার প্রয়োজন তাঁর নেই। তবে তিনি দাবি করেন, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাসহ এলাকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি তাঁর সুপারিশে ছয় শতাধিক লোকের চাকরি হয়েছে।

দুর্গাপুর উপজেলার আটজন আওয়ামী লীগের নেতা ও জনপ্রতিনিধি সাংসদ ওয়াদুদের চাকরি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাঁরা জানান, নয় বছরে দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০৮ জনের নিয়োগ হয়েছে। প্রতিটি নিয়োগের জন্য সাংসদকে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৮ জন বিএনপির, ১৫ জন জামায়াতে ইসলামীর। ৫ জন জেএমবির সদস্য বলেও তাঁরা দাবি করেন। গত ৭ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগপত্রটি পাঠানো হয়। এতে সই করেন দুর্গাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র তোফাজ্জল হোসেন, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও কিসমতগনকৈড় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আফসার আলী মোল্লা, মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বানেছা বেগম এবং পাঁচজন ইউপি চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে সাংসদ ওয়াদুদ বলেন, ‘শুনেছি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের (আসাদুজ্জামান) নেতৃত্বে এটি হয়েছে। যারা একসময় আমার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে, তারাই এগুলো করছে। তারা আরও সুবিধা চায়, পদ চায়।’

উপজেলার ঝালুকা ইউপির চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতা মো. মোজাহার আলী বলেন, সাংসদ ওয়াদুদ দুর্গাপুর ডিগ্রি কলেজ ও কানপাড়া জবেদা ডিগ্রি কলেজে এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকার নিয়োগ-বাণিজ্য করেছেন। মোজাহার নিজেও সাংসদকে আট লাখ টাকা দিয়ে দুজনকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগ অস্বীকার করে সাংসদ ওয়াদুদ বলেন, ‘কোনো দিনই না। ও তো ঘুষখোর, আপনি আরও ১০ জনকে জিজ্ঞেস করুন।’

দুর্গাপুরের ঝালুকা ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মো. এমরান আলী বলেন, সাংসদ ওয়াদুদ টাকা নিয়ে কলেজে অনেককে চাকরি দিয়েছেন। তিনিও কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগে ছেলে জারমান আলীর চাকরির চেষ্টা করেন। এ জন্য সাংসদের চাহিদামতো আট লাখ টাকা জোগাড়ও করেন। তিনি বলেন, ‘ছেলের চাকরির জন্য পুকুর বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু এমপি টাকা নেয়নি। বেশি টাকায় আরেকজনকে চাকরি দিয়েছেন।’

বেলপুকুর ইউপির চেয়ারম্যান ও পুঠিয়া থানা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এমপি একটি পদে চাকরি দিতে অনেক লোকের কাছ থেকে টাকা নেন। যে সবচেয়ে বেশি দেয়, সে বিএনপি হোক, জামায়াত হোক আর জঙ্গি হোক—তাকেই চাকরি দেন।’

এদিকে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাংসদ হওয়ার আগে আবদুল ওয়াদুদের জমি-জিরাত, ফ্ল্যাট ছিল না। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় আবদুল ওয়াদুদ তথ্য দেন, নিজের, স্ত্রীর বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল কারও নামে কৃষি-অকৃষি জমি নেই। সাংসদ হওয়ার পর পাঁচ বছরে সেই অবস্থা পাল্টে যায়। ২০১৪ সালের হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেন, স্ত্রী ও তাঁর কৃষি-অকৃষি জমি আছে। নিজের নামের কৃষিজমির দাম ৬২ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৫ টাকা, স্ত্রীর কৃষিজমির দাম ৪০ লাখ টাকা। আর তিনি যে অকৃষিজমির মালিক হয়েছেন, তার বাজারদর ৪৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮২১ টাকা।

দুটি নির্বাচনী হলফনামা পরখ করে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সাংসদ ওয়াদুদ দুটি জিপগাড়ির মালিক হয়েছেন। একটির দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬৫ লাখ টাকা, আরেকটি সাড়ে ২৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া নিজের ও স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাটও আছে, যার দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ১২ লাখ করে ২৫ লাখ টাকা। যদিও ২০০৮ সালের হলফনামায় শুধু স্ত্রীর নামে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দামের একটি ফ্ল্যাটের উল্লেখ ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, প্রথম পাঁচ বছরেই সাংসদের এত আর্থিক উন্নতি হয়েছে। এই পাঁচ বছরে আরও কত কী হয়েছে, তা জানতে হয়তো আরেকটি হলফনামার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আর্থিক উন্নতির কথা অস্বীকার করেন না সাংসদ। তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সাল থেকে আমি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ী। ১৯৯৫ সালে ১৯৮টি মেশিন দিয়ে যাত্রা শুরু করি। এখন সাড়ে চার হাজার মেশিন আমার গ্রুপের। প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা লভ্যাংশ নিচ্ছি, ব্যবসার কারণেই এই উন্নতি।’

দলীয় সাংসদের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়া না-দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘টাকা দিয়ে চাকরি না পাওয়া, টাকা নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ অনেকেই করেন। এ নিয়ে নেতা-কর্মীদের ভেতরে ক্ষোভ আছে। বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতনদের জানানো হয়েছে।

Check Also

‘ছবি বাইরে গেলে …খবর আছে’

  স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে | নিকলীতে বিএনপির কালো পতাকা মিছিলে পুলিশের হামলার ছবি ধারণ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *