Wednesday , January 17 2018
Home / অপরাধ / দুর্নীতি ঢাকতে অডিটরকে ঘুষ

দুর্নীতি ঢাকতে অডিটরকে ঘুষ

রিপন রুদ্র: করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি সব টাকা। এ অনিয়ম ফাঁসের ভয় দেখিয়ে অডিট টিম পকেটে নিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আউট ডোরে ইসিজি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। সেখান থেকে অডিট টিম নেয় ৬০ হাজার টাকা। মেডিসিন স্টোরে থাকা ওষুধ আর রেজিস্টার খাতার পরিমাণে মিল নেই। সরকারি ওষুধ গেছে বাইরেÑ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার কথা বলে হাতিয়ে নেয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। হ্যাঁ, এমনই লুটপাটের অডিট চলছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। সিভিল অডিট অধিদপ্তরের তিন সদস্যের অডিট টিম এমন অনিয়ম ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল থেকে ইতোমধ্যে ১৭ লাখ টাকা পকেটে ভরেছে। আরও প্রায় ৮০ লাখ টাকা হাতানোর পাঁয়তারা করছে। কারণ অডিট এখনো শেষ হয়নি।

অডিট কেলেঙ্কারি প্রমাণের বেশ কয়েকটি অডিও রেকর্ড এসেছে আমাদের সময়ের হাতে। সেই সূত্র ধরেই অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ঘটনার আদ্যোপান্ত। অডিট কেলেঙ্কারির বিষয়টি অনেকটা খোলামেলা হয়ে গেছে ঢামেক হাসপাতালে। এ কেলেঙ্কারির গল্প এখন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মুখে মুখে। তবে চাকরি হারানোর ভয়ে কেউই মুখ খুলতে চান না।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর। নিয়মানুযায়ী সিভিল অডিট অধিদপ্তরের তিন সদস্যের একটি দল ঢামেক হাসপাতালে (বার্ন ইউনিট ও রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগসহ) অডিট শুরু করে। অডিট টিমের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। এ টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন সিভিল অডিট অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এস এম মোস্তফা কামাল। দলের অপর দুই সদস্য হলেনÑ অডিটর মো. আ. আজিজ ও অডিটর মো. লুলু মিয়া।

অডিও রেকর্ড, ঢামেক হাসপাতাল, অডিট কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢামেক হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামত স্টোর গত বছর ৫ কোটি ৮ লাখ টাকার যন্ত্র কেনে। তবে অডিটের সময় এসব যন্ত্র কেনার হিসাব মেলাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় কেনা হয় সিটিস্ক্যান মেশিনের যন্ত্রাংশ। কিন্তু অডিট টিমকে এই যন্ত্রাংশটুকু দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি মেটাতে অডিট টিমের হাতে ১১ লাখ টাকা তুলে দিয়েছে যন্ত্রপাতি মেরামত শাখার স্টোরকিপার মনোয়ার। সিসিইউ শাখায় করা ইকো ও ইসিজির সব টাকা জমা দেওয়া হয়নি হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে। হিসাবে গরমিল। বিষয়টি মেটাতে সিসিইউর ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স হেনা পারভিনের কাছ থেকে অডিট টিম হাতিয়ে নিয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। একই কাজ করেছে আউটডোরের ইনচার্জ ইউসুফ আলী। তিনিও পরীক্ষার টাকার হিসাব মেলাতে পারেননি। দরকষাকষি করে অডিট টিম তার কাছ থেকে নিয়েছে ৬০ হাজার টাকা।

ঢামেক হাসপাতালে প্রায় ৮০টির বেশি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অডিট টিম। মেডিসিন স্টোরের ওষুধের হিসাবের গরমিল ধরা পড়ে অডিট টিমের কাছে। বিষয়টির সঠিক প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দাবি করে অডিট টিম। অডিট টিমের এক সদস্যের সঙ্গে এই টাকার দেনদরবার করেন ঢামেকের মেডিসিন স্টোরকিপার অনন্ত।

অডিট কর্তৃপক্ষ ও ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জন্য ১০২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দগ্ধ রোগীর চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে এই ইনস্টিটিউট এমনটিই আশা সংশ্লিষ্ট সবার। তবে এখান থেকেও কমিশন চাইছে অডিট টিম! এই টাকার শতকরা এক টাকা হারে টাকা দাবি করেছে অডিট টিম। কিন্তু ৫০ পয়সা হারে দেওয়ার জন্য সব কিছু চূড়ান্ত করেছে বার্ন ইউনিটের অ্যাকাউন্টস অফিসার নাসির ও ওয়ার্ড মাস্টার গফুর। এ ছাড়া ঢামেক হাসপাতালের ৬৪ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজের বিপরীতে ৩২ লাখ টাকা দাবি করেছে অডিট টিম। ঢামেক হাসপাতালের ক্যাশিয়ার আলমগীরের সঙ্গে এ নিয়ে আপসরফা করেছেন একজন অডিটর।

একটি অডিও রেকর্ডে বলতে শোনা যায়, ‘অডিটর বলছেনÑ আপনারা বলার পর আমি কিছু টাকা কমিয়ে নিয়েছি না? জবাবে ঢামেক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, জি ভাই। আপনি আমার ভাই। আপনি অনেক ভালো। টাকা কমিয়ে নিয়েছেন।’
অপর একটি অডিওবার্তায় শোনা যায়, ‘অডিটর বলছেনÑ কবে নাগাদ টাকা দেবেন। জবাবে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলছেন, টাকার জোগাড় হয়ে গেছে। যে কোনো সময় দিতে পারি। অডিও রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে পরে ঢামেক হাসপাতালের অন্তত দুই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে অডিট টিমের প্রধান এস এম মোস্তফা কামালের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আপনি একজন সম্মানিত সাংবাদিক। সামনে আসেন সরাসরি কথা বলব। চা খাব।’ ফোনেই বক্তব্য জানাতে বললে তিনি এই প্রতিবেদককে অভিযোগগুলো লিখিত আকারে তাদের অফিসে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা অডিট টিমকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, এসব বিষয় আমরা জানি না। আর জানার কোনো আগ্রহও আমার নেই। আপনার (প্রতিবেদক) কোনো কিছু জানার থাকলে অফিসে আসেন এবং জেনে নিন।

Check Also

মির্জাপুরে কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরি!

মির্জাপুর টাঙ্গাইল: রাতের আঁধারে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *