Thursday , January 18 2018
Home / তদন্ত প্রতিবেদন / স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের হয়ে কাজ করে করিমুল

স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের হয়ে কাজ করে করিমুল

 

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে |
স্বর্ণ চোরাচালানি সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছিল করিমুল ইসলাম। প্রায় ৩ বছর ধরে সে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েকটি স্বর্ণের চালান নিরাপদে বের করে দিয়েছে। কিন্তু রাতভর জিজ্ঞাসাবাদেও তার মুখ থেকে গোয়েন্দা কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের নাম বের করতে পারেননি গোয়েন্দারা। অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে তাকে তুলে দেন সিলেট পুলিশের হাতে। টানা ৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশের কাছেও কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। এ কারণে গতকাল বিকেলে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে করিমুল ইসলামকে আদালতে সোপর্দ করেছে সিলেটের এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ।

করিমুল ইসলাম সিলেটে বিমানের ম্যাকানিক্যাল সহকারী। ২০১৫ সাল থেকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত রয়েছে। এর আগে সে দেশের বিভিন্ন এয়ারপোর্টে চাকরি করেছে। তার ছোটো ভাই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। করিমুলের মূল বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া  উপজেলায়। সে বিমানের কর্মচারী হিসেবে সিলেটে চাকরিরত অবস্থার পর থেকে বসবাস করছে এয়ারপোর্ট থানার পিছনের আবাসিক এলাকায়। করিমুল গ্রেপ্তারের পর থেকে সিলেটে কর্মরত বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তোলপাড় চলছে। ঘটনাটি বুধবার সন্ধ্যার। ওইদিন সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে সরাসরি অবতরণ করে ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইট। ওই ফ্লাইটে মোট ১৪০ জন যাত্রী ছিলেন। অবতরণের আগেই গোয়েন্দাদের কাছে খবর পৌঁছে ওই ফ্লাইটে করে সিলেটে স্বর্ণের চালান আসছে। এ কারণে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন বিমানবন্দরের শুল্ক গোয়েন্দাসহ সব গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বিমানটি অবতণের পর যখন যাত্রীরা নামছিলেন তখন তাদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে শুল্ক গোয়েন্দাদের একটি টিম উড়োজাহাজের ভেতরে তল্লাশি করতে যান। তারা গিয়ে দেখেন ভেতরে বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসের ক্লিনাররা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত। উড়োজাহাজের ভেতরে দেখা যায় মেকানিক্যাল সহকারী করিমুল ইসলামকে। করিমুল তার মুজার ভেতরে কিছু একটা ঢুকাচ্ছিলেন। এ দৃশ্য দেখেও না দেখার ভান করেন গোয়েন্দারা। পরে মুজার ভেতরে স্বর্ণের চালান ঢুকিয়ে করিমুল বের হওয়ার সময় তাকে চ্যালেঞ্জ করে আটক করা হয়। এক পর্যায়ে তল্লাশিকালে তার মুজার ভেতরেই পাওয়া যায় ৬০পিস স্বর্ণ। যার ওজন প্রায় ৭ কেজি। দাম সাড়ে ৩ কোটি টাকা। সিলেটে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করিমুল ইসলাম সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে সে এ কাজ করছে বলে ইতিমধ্যে তারা খবর পেয়েছেন। সে নিরাপদে কয়েকটি স্বর্ণের চালান বাইরে পাচার করে দেয়। বাইরের স্বর্ণ সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। মোটা টাকার বিনিময়ে সে এসব করেছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টয়লেটের ময়লার সঙ্গে কয়েকটি চালান পাচার করা হয় বলে জানান তারা। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তবে- সিন্ডিকেটের সঙ্গে কারা কারা জড়িত তা জানতে রাতভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ডিজিএফআই, এনএসআই, সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে সে বারবার জানায়, সে একা এই কাজ করছিল। ফ্লাই দুবাইয়ের ১৭ই ও এফ সিটে সে ওই স্বর্ণের চালান পেয়েছে বলে জানায়। এর বেশি কিছু সে জানাতে পারেনি। তবে ওসমানীর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাতে আটকের পর পরই তার মোবাইল ফোনে ঢাকা থেকে ফোন করেছিল ছোটো ভাই। ওই সময় ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হয়- ‘কাজ কী শেষ হয়ে গেছে’। পরে গোয়েন্দারা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ফোনটি কেটে দেয়া হয়। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, ফের স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিমান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। এর মধ্যে করিমুল ইসলামের কাজ ছিল উড়োজাহাজ থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসা। বাইরে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা স্বর্ণের জন্য অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু করিমুল আটকের পরপরই বাইরে অপেক্ষমানরা পালিয়ে যায়। করিমুলের মুখ থেকে তাদের নাম বের করাও সম্ভব হয়নি। সিলেট শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. জাকারিয়া মানবজমিনকে জানিয়েছেন- স্বর্ণ চোরাচালানি সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম তার মুখ থেকে বের করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তাকে এয়ারপোর্ট থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তিনি ধারণা করেন, তার সঙ্গে ওসমানীর ভেতর ও বাইরে স্বর্ণ চোরাচালানি সিন্ডিকেটের যোগাযোগ রয়েছে। এবং সে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছে। এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয় বলে জানান তিনি। এদিকে- গতকাল ভোরে ওসমানীতে স্বর্ণ চোরাচালান জব্দ ও করিমুল ইসলামকে আটকের ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেবাশীষ দাশ রিপন বাদী হয়ে এয়ারপোর্ট থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় তিনি অভিযোগ করেছেন আটক করিমুলের সঙ্গে কয়েকজন ছিল। সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার ওসি মোশারফ হোসেন মানবজমিনকে জানান, করিমুলকে তারা সকালের দিকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু সে মুখ খোলেনি। এ কারণে বিকেলে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলে করিমুলের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।

Check Also

গোপালগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা

শেখ লিপন আহমেদ, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিঃ গোপালগঞ্জ সদর কাঠি ইউনিয়নের ইউপি’র চেয়ারম্যান, মো: বাচ্চু শেখকে প্রধান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *