Thursday , January 18 2018
Home / নির্যাতন / শিশু-কিশোরদের ১৮.৪ ভাগ মানসিক রোগী

শিশু-কিশোরদের ১৮.৪ ভাগ মানসিক রোগী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে প্রতি বছরই মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে। সর্বশেষ জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, দেশে পূর্ণবয়স্কদের অর্থাৎ আঠারো বছরে ওপরে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ আর শিশু-কিশোরদের ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানসিক রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় দেশব্যাপী ২০০৩-০৫ সালে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। ২০০৬ সালে পূর্ণবয়স্কদের ওপর এবং ২০০৯ সালে শিশু-কিশোরদের ওপর চালানো দুটি গবেষণার ফলে এই চিত্র ওঠে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৬ সালে প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের পরিসংখ্যানের মতে, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০১৫ সালে বহির্বিভাগ দিয়ে সেবা নিয়েছেন ৪২ হাজার ৭০৩ জন রোগী, ভর্তি হন ৩ হাজার ৮৫, জরুরি সেবা নিয়েছেন ২ হাজার ৫০১ জন রোগী।

২০১৪ সালে বহির্বিভাগ দিয়ে সেবা নিয়েছিল ৩৫ হাজার ১৪ জন, ভর্তি ছিল ৩ হাজার ১২০ জন আর জরুরি সেবা গ্রহণকারী সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৪৫ জন। ২০১৩ সালে ২৪ হাজার ৯৭৬ জন বহির্বিভাগ দিয়ে সেবা গ্রহণ করেন। ভর্তি ছিলেন ২ হাজার ১৪০ জন আর জরুরি সেবা নিয়েছিলেন ২ হাজার ১০৩ জন রোগী। ২০১২ সালে ২৩ হাজার ৮৯৮ জন বহির্বিভাগ দিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছিলেন। ভর্তি হয় এক হাজার ৯২৮ জন আর জরুরি সেবা গ্রহণকারী এক হাজার ৮২৩ জন। ২০১১ সালে বহির্বিভাগ দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৩ হাজার ৩৮৮ জন, ভর্তি হন এক হাজার ৭৭২ জন আর জরুরি সেবা নেন এক হাজার ৬১১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু রোগী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানসিক রোগীরা আমাদের আপনজন। তারা বিপজ্জনক নয়। এই রোগগুলোর বৈজ্ঞানিক ও ফলপ্রসূ চিকিৎসা রয়েছে। রোগীদের রয়েছে চিকিৎসা পাবার অধিকার। আমাদের সমাজে মানসিক রোগীরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। সমাজ মানসিক রোগীদের অনেক সময় সহজভাবে নিতে পারে না। মানুষ মানসিক রোগীদের বলে ‘পাগল’। মানসিক রোগীদের পাগল বলা সামাজিক অপরাধ। সমাজ মানসিক রোগীদের নিয়ে নানা ধরনের কৌতুক করে। কারো মানসিক রোগ হলে তার কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে নেয় না। মুহূর্তে মানুষ হিসেবে তার দাম কমে যায়। সে বা তিনি উত্তরাধিকার থেকেও অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে যায়। তাকে পরিবারের কোনো সুস্থ সদস্যের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়। সেই আত্মীয়ই তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ তত্ত্বাবধান করে। অনেক সময় ওই আত্মীয় রোগীকে অবহেলা করে। তার যত্ন ও চিকিৎসা বিঘ্নিত হয়। তারা বলেন, যখন পরিবারের কারো মানসিক রোগ হয় তখন গোটা পরিবারই ভয় পেয়ে যায়। তারা কিছুতেই স্বীকার করতে রাজি হয় না যে তাদেরই একজন মানসিক রোগী। যে পরিবারে মানসিক রোগ আছে তাদের বিয়ে হতে সমস্যা হয়। এদিকে জেনেশুনে কেউ মানসিক রোগীকে বিয়ে করবে না। সবাই ভয় পায়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকোথেরাপি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল এ প্রসঙ্গে বলেন, মানসিক রোগ মানেই লজ্জার কোনো কারণ নয়। মানসিক রোগ শারীরিক রোগের মতোই অসুস্থতা। সব মানসিক রোগেরই বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্ভব। বর্তমানে অনেক উন্নত ও কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। এর সুষ্ঠু ব্যবহারে রোগও পুরোপুরি সেরে যাচ্ছে। রোগীরা কর্মক্ষম থাকতে পারছে। কোনো কোনো রোগীকে দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হয়, যেমনটি খেতে হয় অনেক শারীরিক রোগীদেরও, যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ইত্যাদি রোগে প্রায় সারা জীবনই ওষুধ গ্রহণ করে যেতে হয়। আবার অধিকাংশ মানসিক রোগীকেই দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হয় না। মানসিক চিকিৎসাসেবার মান এমনিভাবে নানা আঙ্গিক থেকে সফলতার দিকে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মনোচিকিৎসার পদ্ধতিগুলোও অনেক উন্নততর হয়েছে। বর্তমান সরকারও অটিজমসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যা এবং চিকিৎসার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, মানসিক রোগীরা প্রায়ই অপচিকিৎসার শিকার হয়। তথাকথিত কবিরাজ ও ফকিররা তাদের মেরে, পিটিয়ে, পানিতে ডুবিয়ে, নানাভাবে অত্যাচার করে। তাবিজ-কবজ ও পানি পড়ায় কাজ তো হয়ই না, শুধু বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিতে দেরি হয়ে যায়। ফলে রোগ ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং চিকিৎসা দেয়া জটিল হয়ে উঠে। অনেক সময় রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। তাকে বাড়িতে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাকে জীব-জন্তুর মতো ছোট্ট কোনো ঘরে আটকে রেখে জন্তুর মতোই অবহেলায় খাবার খেতে দেয়া হয়। তাকে কেউ ডাকে না, সামাজিক অনুষ্ঠানে নেয় না, তার সঙ্গে গল্প করে না। তার ছোটরাও তাকে আর সম্মান করে না। গবেষণা দেখা গেছে, ৬২ দশমিক ৩৭ শতাংশ রোগীর যত্নগ্রহণকারী রোগীদের চিকিৎসার জন্য কবিরাজ ও ঝাড়ফুককারীদের কাছে নিয়ে যায়। মানসিক রোগ বিষয়ে অনেক ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। মানসিক রোগের সঠিক চিকিৎসা হলো ধর্মীয়, কবিরাজি, ইউনানী, হেকিমী ও হোমিও চিকিৎসা।
চিকিৎসকরা বলেন, একজন মানসিক রোগীকে সুস্থভাবে জীবনযাপন করাতে তার মর্যাদা সমুন্নত করতে হবে। কারণ সে-ও সমাজেরই অংশ। তাদের জবরদস্তি করা চলবে না। তাদের মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে। তাদের উত্তরাধিকার বঞ্চিত করা যাবে না। মানসিক রোগের কারণে কাউকে চাকরি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়া যাবে না। তাদের পরিবার গঠন করার অধিকার আছে। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে।
দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সুবিধা: দেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল একটি। এতে রয়েছে ২০০ শয্যা। পাবনা মানসিক হাসপাতালে ৫০০ শয্যা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তঃবিভাগ ৪০টি (৮১৩ শয্যা), শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তঃবিভাগ একটি (২০ শয্যা), সাইকিয়াট্রিক চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক ২টি, ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিক বিষয়ে শয্যা ১০টি, মাদকাসক্তি বিষয়ক চিকিৎসা কেন্দ্র সরকারি ৪টি ও বেসরকারি ১৬৪টি। মানসিক রোগীদের সেবা দেয়ার মতো দক্ষ জনবল খুবই সীমিত। দেশে মানসিক রোগের ডাক্তার রয়েছেন দু’শ’র কিছু বেশি, যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য রয়েছে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন ৫০ জন। দেশে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং বা সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কের ওপর কোনো প্রশিক্ষণ কোর্স নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল সোস্যাল ওয়ার্ক নামে একটি কোর্স চালু হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বৃটিশ আমলে প্রণীত অতি প্রাচীন ‘লুনাসি অ্যাক্ট’কে প্রতিস্থাপনের জন্য- ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন’ দীর্ঘদিন সরকারের বিবেচনায় থাকার পর মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে উঠছে। এ ছাড়া ‘মানসিক স্বাস্থ্য পলিসি’ প্রণয়নের কাজ চলছে। এগুলো প্রণীত হলে মানসিক রোগীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এগুলো সহায়ক হবে। মানসিক রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়াও খুব জরুরি। রোগ হয়ে যাওয়ার থেকে হওয়ার আগে প্রতিরোধ করাই উত্তম। এর জন্য পরিবারে, স্কুলে ও সমাজে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিকভাবে শিশু প্রতিপালন করতে হবে, শিশুকে মাঠে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে দিতে হবে, ভালো স্কুলে পড়াতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এভাবেই আমরা পারি মানসিক রোগীদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়। দরকার সবাই মিলে একজন রোগীকে সেবা দেয়া। আইনটি প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, বেশ কয়েক বছর আগেই তারা এই আইনের বিষয়ে কথা বলেছেন। এখন অনুমোদন হলে বোঝা যাবে এতে কি কি রয়েছে।

Check Also

রাজধানীতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

  নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর পল্লবীর কালশীতে আসমা আক্তার রেবু (২৬) নামে এক অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পিটিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *