Wednesday , January 17 2018
Home / অপরাধ / বেপরোয়া ছিনতাই

বেপরোয়া ছিনতাই

 

স্টাফ রিপোর্টার |
মোটরসাইকেল থেকে এক নারীর ব্যাগ ধরে টান দিয়ে বিপাকে পড়েছে এক ছিনতাইকারী। পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে পথচারীরা আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে কাফরুল থানা পুলিশ এসে ওই ছিনতাইকারীকে উদ্ধার করে তাদের হেফাজতে নেয়। ঘটনাটি ঘটে সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুর এলাকার বিআরটিএ’র সামনে। ফয়সাল রহমান সোহেল নামের ৩০ বছর বয়সী ওই যুবক পেশায় একজন ছিনতাইকারী। বায়িং হাউজে চাকরি যাওয়ার পর থেকে ৩ বছর ধরে ছিনতাইকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় সোহেল।

কাফরুল থানা পুলিশ তাকে নিয়ে মিতালী হাউজিংয়ের ১৬ নম্বর বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার, ৬০টি ব্যাগ ও পার্স , বিভিন্ন জনের জাতীয় পরিচয়পত্র, ২৫০টি চাবি, নগদ ২৪ হাজার টাকা ও বেশকিছু ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার করেছে। এ বাসায়ই সে থাকতো। সোহেল পুলিশকে জানিয়েছে সে একটি ছিনতাইকারী চক্রের দলনেতা। তাদের চক্র মিরপুর ১০ থেকে ১৪ নম্বর পর্যন্ত এলাকায় ছিনতাই করে। কাফরুল থানা পুলিশ তাকে গতকাল আদালতে পাঠিয়েছে। সম্প্রতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন অসংখ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সূত্র জানিয়েছে, শুধুমাত্র ঢাকা শহরে অন্তত দেড় শতাধিক ছিনতাইকারী চক্র কাজ করছে। কখনো রাতে আবার কখনো প্রকাশ্যে তারা ছিনতাই করছে। রোববার রাতের ঘটনা। মিরপুরের একটি বায়িং হাউজের সহকারী ব্যবস্থাপক রিয়াজ হোসেন। অফিস থেকে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন। ফেরার পথে দারুস সালাম ব্রিজের নিচে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল থামিয়ে মুঠোফোনে কথা বলছিলেন বন্ধুর সঙ্গে। ঠিক তখনই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে রিয়াজের কাছে থাকা ব্যাগ টানাটানি শুরু করে দু’যুবক। একজন ব্যাগ ধরে টানছে আর অপরজন তার মোবাইল ফোন টান দেয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে এক যুবক তার হাতে ছুরিকাঘাত করে। পরে ছিনতাইকারীরা তার কাছে থাকা ল্যাপটপ, স্যামসাং মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগে থাকা ৪ হাজার টাকা নিয়ে যায়। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে থানায় অভিযোগ না করে তিনি বাসায় চলে যান। শুধু রিয়াজ হোসেন নন রাজধানী ঢাকা শহরে গত কয়েক মাস ধরে অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কখনো অস্ত্র ঠেকিয়ে আবার কখনো টান দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা। আর এসব ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগীরা আহত হওয়ার পাশাপাশি হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেয়া তথ্যানুযায়ী শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে ৬০ জন আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকেই মারাত্মক জখমের শিকার হয়েছেন। তাদের হাসপাতাল থেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ আরো অনেক হাসপাতালেও ছিনতাইকারীর কবলে পড়া ভুক্তভোগীরা চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মৃত্যুবরণও করেছেন অনেকে।
চার বছরের শিশুপুত্রের চিকিৎসার জন্য গতমাসে ঢাকা আসেন শাহ আলম দম্পতি। ভোরে লঞ্চে সদরঘাটে নেমে রিকশা করে যাচ্ছিলেন বোনের বাসায়। রিকশাটি দয়াগঞ্জ ব্রিজ পার হয়ে ১০০ গজ সামনে গেলে শাহআলমের স্ত্রী আকলিমা বেগমের কাছে থাকা ব্যাগে টান দেয় এক যুবক। টানাটানির এক পর্যায়ে আকলিমার কোলের ৬ মাস বয়সী শিশু আরাফাত পড়ে যায়। ছিনতাইকারী তখন ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ায় স্তব্ধ হয়ে যায় শিশু আরাফাত। শাহ আলম দম্পতি আরাফাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।  একইভাবে ২৯শে নভেম্বর এক চিকিৎসক প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। চলন্ত রিকশায় ওই চিকিৎসকের ব্যাগ ধরে টানাটানির এক পর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে তিনি ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে চিকিৎসারত অবস্থায়ই তিনি ৪ঠা ডিসেম্বর মারা যান। এসব ঘটনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়েও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে ব্যাংকে লেনদেনকারীদের টার্গেট করে ছিনিয়ে নেয়া হয় লাখ লাখ টাকা। ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা ব্যাংকের উত্তরা শাখা থেকে ৪০ লাখ টাকা তুলে অফিসে ফিরছিলেন টোকিও মুড গ্রুপের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাঈদ মাহমুদ। দুপুর আড়াইটার দিকে উত্তরা ১৩ নম্বর সড়ক থেকে ৫ নম্বর সড়কে যাবার পথে তাকে বহনকারী মাইক্রোবাসটি যানজটে পড়ে। ঠিক তখনই ডিবি পরিচয়ে ৫ জন লোক এসে তাদের গাড়িতে অবৈধ পণ্য আছে বলে গাড়ি তল্লাশি করতে চায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা নিজেই গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে চালক রবিউল ইসলাম ও সাঈদ মাহমুদকে মারধর করে বেঁধে ফেলে। একপর্যায়ে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় তাদেরকে রেখে ৪০ লাখ টাকাসহ ব্যাগ, কয়েকটি মোবাইল ফোন ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে ছিনতাইকারীরা  চলে যায়।
এদিকে ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটনার পর ২১শে ডিসেম্বর পুলিশকে নির্দেশনা দেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তার নির্দেশনার পরেই ছিনতাইকারীদের ধরার জন্য বিশেষ অভিযানে নামে মহানগর গোয়েন্দা টিমের সদস্যরা। এছাড়া থানা পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযান চলছে। বেপরোয়া ছিনতাইয়ে নগরবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ সহনীয় করতে বিশেষ অভিযানে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে পুলিশের অভিযানে ৩৫ জন, ১৯শে ডিসেম্বর মোহাম্মদপুর থেকে র‌্যাবের অভিযানে ৭ জন আর ২৬শে ডিসেম্বর নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫৬ জনকে আটক করেছে ডিবি। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিতই ছিনতাইকারীদের আটক করছেন। কিন্তু তারপরও বন্ধ হচ্ছে না ছিনতাই। প্রতিদিন রাতের বেলা কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকেও এখন এসব ঘটনা ঘটছে। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ছিনতাই ঠেকাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চলমান আছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, সম্প্রতি ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশের সব বাহিনী সমান তালে কাজ করছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়েছে।

Check Also

মির্জাপুরে কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরি!

মির্জাপুর টাঙ্গাইল: রাতের আঁধারে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *