Thursday , January 18 2018
Home / আন্তর্জাতিক / আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশে বিতাড়ন

আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশে বিতাড়ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আসামে বাংলাভাষী বা বাংলাভাষী মুসলিম ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অন্যদিকে আসামে বসবাসকারী অনেক মুসলিম বাংলাভাষীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। ন্যাশনাল রেজিস্ট্রোর অব সিটিজেনস (এনআরসি)-এর প্রাথমিক খসড়া তালিকায় তাদের অনেকের নাম নেই। তাই তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভুগছেন। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে, এমন রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারেন ৩০ থেকে ৪০ লাখ বাংলাভাষী মুসলিম।

তাদেরকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এরই মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, আসামে বাঙালিদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাদের গায়ে হাত পড়লে তিনি ছেড়ে কথা বলবেন না। কিন্তু বিজেপির অভিযোগ, এনআরসি নবায়ন করার বিরোধিতা করছেন মমতা। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনে তিনি ‘অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের’কে ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করতে চান। বিজেপির এমপি রাম প্রসাদ শর্মা বলেছেন, মমতা বাংলাদেশী ভোটব্যাংক অটুট রাখতে চান। এসব খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য ইকোনমিক টাইমস ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আসামে বসবাস করেন মর্জিনা বিবি। তাকে রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা হতে পারে বলে আতঙ্কিত তিনি। নাগরিকত্বের যে প্রাথমিক তালিকা রোববার মধ্যরাতে প্রকাশিত হয়েছে তাতে ২৬ বছর বয়সী মর্জিনার নাম নেই, যদিও তার আছে ভোটার পরিচয়পত্র, ২০১৬ সালের বিধানসভার নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। মর্জিনা বিবির প্রশ্নÑ আমার সঙ্গে তারা এসব করছে কেন? আসামের ফোফেঙ্গা গ্রামে তার বসতি। মর্জিনা বলেন, তারা মনে করেছে আমি একজন বাংলাদেশী। কিন্তু আমার জন্ম এই আসামে। আমার পিতামাতার জন্ম আসামে। তাই আমি একজন ভারতীয়।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় আসাম থেকে অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের বের করে দেয়ার ঘোষণা দেয় বিজেপি। তারা বলে, এসব অভিবাসী সেখানে গিয়েছে বাংলাদেশ থেকে। এ ইস্যুতে প্রচারণা চালিয়ে ২০১৬ সালের এপ্রিলে আসামে ক্ষমতায় যায় বিজেপি। এরপরই শুরু হয় ওইসব বাংলাভাষীদের আসাম থেকে বের করে দেয়ার তৎপরতা। তবে অধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলেন, বিজেপি সরকারের এ উদ্দেশের কারণ হলো মুসলিমদের টার্গেট করা। এসব মুসলিম ভারতীয় নাগরিক। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির দু’জন মুখপাত্র। এ বিষয়ে নয়া দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে রয়টার্স। সংস্থাটির সাংবাদিকরা ইমেইল ও টেলিফোনে তার মন্তব্য প্রত্যাশা করেন। কিন্তু কোনো জবাব দেয়া হয় নি মন্ত্রণালয় থেকে। আসাম হলো চা উৎপাদনশীল ও তেলসমৃদ্ধ রাজ্য। এখানে ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশই হলেন মুসলিম। এই রাজ্যে নাগরিকত্ব ও অবৈধ অভিবাসন উত্তেজনাকর ইস্যু। স্থানীয় আসামী গ্রুপগুলোর অভিযোগ, বহিরাগতরা সেখানে গিয়ে কাজ লুফে নিচ্ছে। সম্পদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এ নিয়ে ১৯৮০র দশকে ভয়াবহ সহিংসতা শুরু হয়। তখন হত্যা করা হয় কয়েক শত মানুষকে। ১৯৫১ সালের পর এবারই প্রথম নতুন করে নবায়ন করা হচ্ছে নাগরিকত্ব। এতে নাম তালিকাভুক্ত রাখতে একজন নাগরিককে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। তাতে প্রমাণ দিতে হবে যে, তার পরিবার ১৯৭১ সালের ২৪ শে মার্চের আগে থেকে ভারতে বসবাস করছে। এমনটা দেখাতে পারলে তাকে ভারতের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। প্রাথমিক এনআরসি মতে, আসামের প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ মানুষকে নাগরিক হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে এ বছরের জুলাইয়ে। এ বিষয়ে মর্জিনা বিবি সহ প্রায় দু’ডজন মুসলিমের সঙ্গে কথা বলেছেন রয়টার্সের সাংবাদিক। তারা বলেছেন, প্রাথমিক তালিকায় তাদের নাম নেই। মর্জিনা বিবি বলেন, আমরা মুসলিম। আমার মনে হচ্ছে এ কারণেই আমাদেরকে টার্গেট করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তিনি এরই মধ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, তিনি ভারতীয়। তবে বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসী এমন অভিযোগে তিনি এরই মধ্যে আট মাস জেল খেটেছেন। এ সময় গ্রামবাসী ঘিরে ধরেন। তখন মর্জিনা সবাইকে দেখান তার আছে ভোটার পরিচয় পত্র এবং তাকে ছেড়ে দেয়ার কোর্টের নির্দেশ।
বিজেপি বলেছে, আগের সরকারগুলো নির্বাচনে বিজয়ী হতে ভোট কেনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে অনেক বাংলাদেশী অভিবাসীকে। স্থানীয়ভাবে মুসলিম প্রধান একটি এলাকায় বসানো হয়েছে এনআরসি অফিস। ওই এলাকায় আবেদন করেছেন প্রায় ১১ হাজার মানুষ। তার মধ্যে মাত্র ৪ হাজার ৫০০ মানুষের নাম উঠেছে প্রাথমিক তালিকায়। ওই কেন্দ্রটির দায়িত্বে আছেন সরকারি কর্মকর্তা গৌতম শর্মা। তিনি বলেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, এটা অসম্ভব। আমরা শুধু প্রমাণপত্র দেখি। তারা যেসব প্রমাণপত্র দিচ্ছেন তার ওপর ভিত্তি করে যাচাই-বাছাইয়ে সময় কম বেশি লাগে। এনআরসি অফিস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন একজন হিন্দু। তার মুখে হাসি। তিনি রয়টার্সের সাংবাদিককে বলেন, তার পরিবারের ৬ সদস্যের সবার নামই আছে ওই তালিকায়। এর অল্প সময় পরেই তাদের নবজাতক সন্তানদের নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু তারা ফিরে যান হতাশ হয়ে। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলাদেশ। এরপর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে ভারতে চলে যান। তাদের অনেকেই বসতি গড়েন আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গেও অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর দাবি রয়েছে। তবে অভিবাসীদের মধ্যে অনেকেই হন্দিু। তবে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি বলেছে, তারা হিন্দুদের ফেরত পাঠাবে না। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্বশর্মা নাগরিকত্ব রেজিস্টার বিষয়ক দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেছেন, যাদের নাম চূড়ান্ত এনআরসিতে থাকবে না তাদেরকে আলাদা করে ফেলা হবে। তবে তাদেরকে বের করে দেয়ার বিষয়টি দেখবে কেন্দ্রীয় সরকার। বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার হিন্দুদেরকে ভারতে ঠাঁই দেয়া হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানও এটা।
ওদিকে মুসলিমদেরকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মতো রাষ্ট্রহীন করে দেয়ার একটি অস্ত্র হিসেবে এনআরসি’কে ব্যবহার করছে সরকার- এমন অভিযোগ করছেন মুসলিম নেতারা। তারা অস্থিরতার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

Check Also

ভারতের জেল থেকে ৩ বাংলাদেশী বন্দির বলিউডি স্টাইলে পলায়ন

এ যেন ঠিক কোন এক জেল পালানো বলিউডি ছবির ঘটনা। ছবিতে যেমন দেখা যায় জেলের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *