Wednesday , January 17 2018
Home / বাংলাদেশ / নৌবাহিনীকে ‘বিল্ডার নেভি’তে পরিণত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

নৌবাহিনীকে ‘বিল্ডার নেভি’তে পরিণত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ধীরে ধীরে ‘বায়ার নেভি’ থেকে ‘বিল্ডার নেভি’তে পরিণত করা হবে বলে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ চট্টগ্রামের বাংলাদেশ নেভাল একাডেমিতে রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ মিডশিপম্যান-২০১৫ পরিদর্শন এবং বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ধীরে ধীরে ‘বায়ার নেভি’ থেকে ‘বিল্ডার নেভি’তে পরিণত করা হবে এবং একদিন আমরা যুদ্ধজাহাজ রপ্তানি করবো ইনশাআল্লাহ।’
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময়ে এসেই দেশে নৌবাহিনীর দক্ষ ব্যবস্থাপনায় খুলনা শিপইয়ার্ড এবং নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ডে দেশীয় প্রযুক্তিতে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মিত হচ্ছে । গত মাসে খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত দু’টি সাবমেরিন বিধ্বংসী লার্জ পেট্রোল ক্রাফট ‘দুর্গম’ ও ‘নিশান’ নৌবহরের কমিশন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেডে আধুনিক ফ্রিগেট তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বলেন, একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্য হিসেবে সর্বদা উর্ধ্বতনদের প্রতি আনুগত্য ও অধঃস্তনদের সহমর্মিতা প্রদর্শন করবে। চেইন অফ কমান্ড মেনে চলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে বিশ্ব দরবারে আরও গৌরবোজ্জ্বল আসনে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। তিনি পাসিং আউট ক্যাডেটদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার মহান দায়িত্বে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী সালাম গ্রহণ করেন এবং কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে তিন বছরে প্রশিক্ষণে সব বিষয়ে সর্ব্বোচ্চ মান অর্জনকারি ক্যাডেটকে সোর্ড অব অনার প্রদান করেন। ২০১৫ ব্যাচের সোহানুর রহমান সকল বিষয়ে সর্ব্বোচ্চ মান অর্জন করে প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে ‘সোর্ড অব অনার’ লাভ করেন।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মিডশিপম্যান সীমান্ত নন্দী আকাশ ‘নৌবাহিনী প্রধান স্বর্ণ পদক’ এবং ডাইরেক্ট এন্ট্রি অফিসার অ্যাক্টিং সাব লেফটেন্যান্ট এ জেড এম নাসিমুল ইসলাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্বর্ণ পদক’ গ্রহণ করেন । পরে প্যারেড কমান্ডার নবীন অফিসারদের শপথ গ্রহণ করান।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম নৌ ঘাঁটিতে এসে পৌঁছলে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল এম আবু আশরাফ তাকে স্বাগত জানান।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, কূটনৈতিকবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের অংশগ্রহণে গত মাসেই কক্সবাজারে আইওএনএস মাল্টিলেটারাল মেরিটাইম সার্চ এন্ড রেসকিউ এক্সারসাইজ-এর মতো বৃহৎ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ মহড়ার সফল আয়োজন আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও উন্নয়নে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য বহির্বিশ্বে এখন পথিকৃত ধরা হয়।
বর্তমান সরকার সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশী টেরিটোরিয়াল সী, ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশের সম্পদের অধিকার লাভ করেছি।
পাসিং আউট ক্যাডেটদের অভিনন্দিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তোমরা যারা কমিশন লাভ করতে যাচ্ছ, তোমাদের সকলের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
তিনি বলেন, আমি জেনে খুবই আনন্দিত যে, এবার ২১ জন মহিলা কর্মকর্তা কমিশন পেতে যাচ্ছে। যা নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের বহিঃপ্রকাশ।
তার সরকারের সময়ে নৌবাহিনীকে একটি অত্যাধুনিক আধুনিক ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত করার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জলসীমায় নজরদারী বাড়াতে আরও মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফ্ট ও হেলিকপ্টার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে পটুয়াখালীতে এভিয়েশন সুবিধা সম্বলিত নৌবাহিনীর সর্ববৃহৎ নৌঘাঁটি ও ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নৌঘাঁটি নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া সাবমেরিনের সুষ্ঠু পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জেটি সুবিধা প্রদানের জন্য কুতুবদিয়ায় একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সন্দ্বীপ চ্যানেলে জাহাজ বার্থিং সুবিধা সংবলিত ফ্লিট সদর দপ্তরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এর ফলে সমুদ্র এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে বলে।
সরকার প্রধান বলেন, বিভিন্ন সময় দেশে ও পার্শ্ববর্তী দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং যেকোন ক্রান্তিকালে নৌবাহিনীর সদস্যদের নিবেদিত প্রাণ অংশগ্রহণ বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে গৌরবান্বিত করেছে।
তিনি আর্ত-মানবতার সেবায় এগিয়ে আসায় নৌবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়নে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে নৌবাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নৌবাহিনীর গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমায় মৎস্য, খনিজ তেল ও অন্যান্য খনিজ পদার্থসহ মূল্যবান সম্পদ রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যপরিধি এখন অনেক বেড়ে গেছে।’
বাংলাদেশ নেভীর গোড়াপত্তন এবং অধুনিকায়নে জাতির পিতার ভূমিকা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় নৌবাহিনীর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, তাই তিনি ১৯৬৬’র ৬-দফায় পূর্ববঙ্গে নৌবাহিনীর সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজনে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলার প্রত্যয় থেকেই তিনি (বঙ্গবন্ধু) ১৯৭৪ সালে নৌবাহিনীর বৃহত্তম প্রশিক্ষণ ঘাঁটি বানৌজা ঈসা খাঁ কমিশন করেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে নেভাল এনসাইন প্রদান করেন। একটি দক্ষ নৌবহর গঠনের লক্ষ্যে যুগোস্লাভিয়া ও ভারত থেকে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ সংগ্রহ করেন। একইসাথে তিনি দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সনে ‘দ্য টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস এন্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ ও প্রণয়ন করেন।
তরুণ প্রজন্ম থেকে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য আধুনিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা এই একাডেমিতে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছি, যা আজ উদ্বোধন হল।
তিনি বলেন, এই কমপ্লেক্সের মাধ্যমে নেভাল একাডেমিতে প্রশিক্ষণ সুবিধা বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আরও অধিক সংখ্যক দেশি-বিদেশী প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তার সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমের খণ্ডচিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা কেবল সশস্ত্র বাহিনী নয়, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, বিগত ছয় বছরেই সার্বিক দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। দেশে হতদরিদ্রের অবশিষ্ট সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ।
২০২১ সনের মধ্যে দেশকে দারিদ্র্য মুক্ত করাই তার সরকারের অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের খাদ্য বহির্ভূত ব্যয় বেড়েছে, যা উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য নির্দেশক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার বরাবরই শহর ও গ্রামের সুষম উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার নীতি গ্রহণ করেছে।’
এ সময় কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খোলায় তাঁর সরকারের পদক্ষেপের প্রসংগ উল্লেখ করে প্রদানমন্ত্রী বলেন, কৃষকের জন্য খোলা ব্যাংক হিসাবে এক হাজার তিনশ’ কোটি টাকা সঞ্চয় হয়েছে। এ উদ্যোগে আয় বৈষম্য কমেছে।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্ট হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে জাতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে আরো মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
শীতকালিন এই কুচকাওয়াজের মধ্যদিয়ে ২১ জন মহিলা, একজন শ্রীলংকান, একজন মালদ্বীপসহ ৯২ জন মিডশিপম্যান এবং ১২ জন ডাইরেক্ট এন্ট্রি অফিসারসহ মোট ১০৪ জন কমিশন লাভ করেছেন।-

Check Also

শিক্ষার্থীদের খুলি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বছর বছর বেতন বৃদ্ধি বন্ধসহ আট দফা দাবিতে আন্দোলনে নামা বেসরকারি এম এইচ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *