Wednesday , January 17 2018
Home / বাংলাদেশ / বিজয়ের মাসেই বীরের মৃত্যু রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, চট্টগ্রাম

বিজয়ের মাসেই বীরের মৃত্যু রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, চট্টগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

লক্ষ মানুষকে শোকের ভেলায় ভাসিয়ে না ফেরার দেশে গেলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, চট্টলবীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী (ইন্নালি­লাহে….রাজেউন)। ষাটের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে টানা প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই চাটগাঁর বাঘের বিদায়টিও যেন বর্ণাঢ্যতায় ভরা।

কী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে, কী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিরোধ যুদ্ধ গঠনে, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এবং হাল আমলেও উন্নয়ন ইস্যুতে সরব সক্রিয় থাকা মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকাবিভূত চট্টগ্রাম। দলমত নির্বিশেষে অভিভাবক হারানোর শোকের মাতম এল চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের এই হ্যাট্রিক মেয়রের মৃত্যুতে রাজনীতির মাঠের ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’র বাঁশি হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু লক্ষ-কোটি মানুষের মনের শ্রদ্ধা-আবেগ অনুভ‚তি আর বিনম্র প্রার্থনায় যেন বেঁচে আছেন, থাকবেন মহিউদ্দিন।

শুক্রবার ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ও সাবেক মেয়রের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে, তখনো হাজার হাজার মানুষ তার শয্যাস্থল মেহেদিবাগের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিকে ঘিরে ছিলেন। জননেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের খবরটি যখন তার পুত্র ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ঘোষণা দেন, ঠিক তখনই যেন আকাশ থেকে খসে পড়ে নক্ষত্র। মুহূর্তেই হু হু করে আর্তনাদ করে ওঠেন অগুনতি নেতাকর্মী।

এর আগেই সন্ধ্যা থেকেই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে দুই দফা হার্ট অ্যাটাক করেন তিনি। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা শেষে ঢাকায় ক’দিন থেকে চট্টগ্রামে ফেরার তিনদিনের মাথায় ফের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এই জননেতা।

হাজার হাজার মানুষ প্রত্যাশা করছিলেন তিনি যেন আবার সবার মাঝে ফিরে আসেন। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের বার্তাটি জানাতেই হল তার পুত্রকে।বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুত্র ব্যারিস্টার নওফেল সাংবাদিকদের হাসপাতালে কমপ্লেক্সে বাবার বিদায়ের বার্তাটি জানালেন, ‘ভেনটিলেটর সাপোর্টে ছিলেন বাবা। আর কোন রেসপন্স না পাওয়ায় লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ’

দফায় দফায় ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিল এই প্রবীণ নেতার। শেষ দিকে কিডনি আর কাজ করছিলো না। ডায়ালাইসিস হচ্ছিল। অবশেষে বৃহস্পতিবার থেকে আর তাও সম্ভব হয়নি। লক্ষ মানুষের শোক-কান্নার রোল, স্মরণকালের সবচে বড় জানাজা শেষে চশমা হিলের নিজ বাসভবনের পাশেই শেষ শয্যায় শায়িত হলেন চাটগাঁর উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অধিকারের স্বাপ্নিক পুরুষ চট্টলবীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

অস্তাচলে চট্টলবীর : বিজয়ের মাসেই বীরের প্রয়াণ :

চট্টলবীর, চট্টলশার্দুল কিংবা চাটগাঁর বাঘ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, গণমানুষের মনের গহীনে যার ঠিকানা, তিনি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাসে জন্ম, বিজয়ের মাসেই বিদায় নিলেন তিনি।

ষাটের রাজনীতি থেকে মুক্তিযুদ্ধ, অতঃপর মহিউদ্দিন :

ষাটের ছাত্র রাজনীতিতে সামরিক পাক শোষকের বৈষম্যরীতির বিরুদ্ধে ৬ দফা, ১১ দফা ও এক দফার আন্দোলনের মাঠের কর্মী বঙ্গবন্ধুর স্নহেধন্ মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে গ্রেফতার হন। পাকিস্তানি নেভাল বেইসের টর্চার ক্যাম্পে নির্যাতিত হন। পরে পাগলের বেশে কারাগার থেকে বের হয়ে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে যুক্ত হন ‘মাউন্টেন্ট ডিভিশনে’। বিএলএফ কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে সক্রিয় মহিউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের পরে চট্টগ্রাম শহরের রাজনীতিতে ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ হয়ে ওঠেন। ক্রমে ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতা থেকে পরিণত হন জাতীয় নেতায়।

প্রতিরোধ যুদ্ধ, বন্দরটিলা ট্র্যাজেডি ও অন্যান্য:
’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রথমে দেশে ও পরে ভারতে পলাতক অবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্রিয় হন। ভারতে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ সহজতর না হলে কঠিন মানবেতর জীবনে পড়েন তিনি। কারখানার শ্রমিক, টংয়ের চা বিক্রেতাও হতে হয় তাকে। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রধানতম নেতা হয়ে ওঠেন মহিউদ্দিন পরবর্তীতে ‘বন্দরটিলা ট্র্যাজেডি’তে গান পাউডারে ক্ষতবিক্ষত মানুষের লাশ নিজের হাতে ধুয়ে ও দাফন করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টিভিডোরিং কোম্পানির ‘এস এস এ পোর্ট’ প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সফল আন্দোলন করে বিশেষ করে সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি দিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হন মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের পেশাজীবী-নাগরিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে প্রণোদনা দানকারি মহিউদ্দিন চৌধুরী ‘গণজাগরণ’সহ সর্বশেষ বিএনপি-জামায়াতের পেট্রোলবোমা-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে নগরীর ২৩টি পয়েন্টে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের উদ্যোগ নিয়েও রাখেন প্রধান নেতৃত্বের ভ‚মিকা। সর্বশেষ অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি কর্মী বাহিনী দিয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পাশে মানবিকতায় সচেষ্ট ছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমসের দুর্নীতিবাজদের রুখতে কখনো, কখনো নৌপরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্যরোধে, কখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নিজদল ও বিরোধী মেয়রের বিপক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েও আলোচনায় আসেন। এছাড়াও কখনো ফিলিস্তিনে মজলুম জনতার অসহায়ত্বেও লালদিঘি মাঠে সমাবেশ করে মুজাহিদ পাঠানোর ঘোষণাও দেন এই চট্টলবীর।

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা :

চট্টগ্রামের উন্নয়নের এই স্বপ্নবান পুরুষ চসিককে আত্মনির্ভরশীল ও প্রকৃত সেবামূলক করতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সিএনজি পাম্প থেকে শুরু করে ওষুধ তৈরি ও পানি প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈদ্যুতিক জ্বালানি উৎপাদন, শপিং কমপ্লেক্স, আবাসন প্রতিষ্ঠাসহ বহুমাত্রিক উদ্যোগ নেন। রিকশাচালকদের লাইসেন্স ফি মওকুফ ও নগরবাসীর হোল্ডিং ট্যাক্স বর্ধিত না করেও ব্যাপক প্রশংসা পান সর্বশেষ হারিকেন প্রতীকে বিপুল বিজয়ী মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী।

সেই গ্র্যান্ড হোটেল আর বিজয়মেলার মহিউদ্দিন :

রাজনীতির প্রাথমিক পাঠে সিটি কলেজ ও গ্র্যান্ড হোটেলকেন্দ্রিক নিজস্ব বলয় তৈরি করেন তিনি। নিজের অনুগত ছাত্র-যুব নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণের অসম্ভব ক্ষমতাও ছিল এই বিশাল বিটপী নেতার। ১৩ ছাত্রনেতা আত্মসমর্পণ করিয়ে আলোচিত হন মহিউদ্দিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল শিক্ষক আন্দোলন, বিভাগীয় স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে আন্দোলনেও সর্বাত্মক সমর্থন সহযোগিতা দেন এই নাগরিক আন্দোলনের প্রতীভপুরুষ। হয়তো এসব কারণেই তার অনুসারী পেশাজীবী-রাজনীতিবিদগণ ‘ওয়ান ইলেভেনে’র দুর্মর সময়েও জরুরি আইন ভেঙ্গে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কারামুক্তি দাবিতে মিছিল করে নিজেরাই কারাবরণ করেন।

এদিকে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা আয়োজন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও নবপ্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে অনন্য ভূমিকা রাখেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার নেতৃত্ব প্রায় তিন দশক ছুঁতে চলা এই মেলা আজ চাটগাঁর গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র ‘মুক্তিযুদ্ধ চট্টগ্রাম’ও নির্মাণ করেন এই বীরযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের বইমেলারও প্রবক্তা তিনি।

নোমান-মহিউদ্দিন জুটি:

হুমকি-ধমক, হাস্যরস আর দরদভরা চাটগাঁ ভাষার গালিতে স্বকীয় পরিচিতির অধিকারী প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে প্রধান বিপরীত পক্ষ বিএনপির শীর্ষ নেতা সাবেক মন্ত্রী আবদুল­াহ-আল নোমানের সাথেও ‘মামা-ভাগ্নে’র জুটি গড়ে তুলেছিলেন।

সেই ডিসেম্বর-এই ডিসেম্বও :

১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর উত্তর চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা গ্রামে জন্ম মহিউদ্দিন চৌধুরীর। বিদায় নিলেন গতকাল ১৫ ডিসেম্বর নগরীর মেহেদিবাগের ম্যাক্স হাসপাতালে। চিরশয্যায় শায়িত হলেন নগরীর চশমা হিলের নিজ বাড়ি লাগোয়া কবরস্থানে।

সাংগঠনিক দক্ষতা, নিজস্ব ক্যারিশমার কারণে পর পর চারবার মেয়র পদে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার মনোনয়ন পান মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মেয়র দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। প্রধান বন্দর শহর ‘চট্টগ্রাম’ এর হ্যাট্রিক মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্বপালন করেন তিনি। তার কর্মকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নানা আয়বর্ধক ও সেবা প্রকল্প গ্রহণ করে, যা দেশের যেকোনো সিটি করপোরেশনে নজিরবিহীন।

গহিরা থেকে বিশ্বালোকে :

গহিরার নিভৃত গ্রাম থেকে বন্দর শহর চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়ে সুনাম স্বীকৃতি পান বর্ষীয়ান নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। নিজ গ্রামে রাজনীতিতে অসফল-অনিচ্ছুক হলেও বন্দর শহরে ষাটের ছাত্র রাজনীতি থেকে কৃষক-শ্রমিক রাজনীতির মাঠ ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচিত মুখে পরিণত হন তিনি।

কাঁদো, চট্টগ্রামবাসী কাঁদো :

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বিদায় নেওয়া বীর মহিউদ্দিনকে হারিয়ে চাটগাঁবাসীর অভিভাবকশূন্যতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক হারে প্রকাশ পেয়েছে। ডুকরে কান্নারত শোকার্ত চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়চিত্তে রব ওঠেছে,

‘‘কর্ণফুলীর ঢেউতরঙ্গে প্রতিদিন,
মহিউদ্দিন, মহিউদ্দিন। ”

শেষ বিদায় লক্ষ মানুষের জানাজা ও ঘরে ঘরে শোকের মাতমে যেন চাটগাঁয় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, সেই পুরনো স্লো­াগান ‘বীর মহিউদ্দিন চট্টলার/রুখে মহিউদ্দিন সাধ্য কার!

Check Also

শিক্ষার্থীদের খুলি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বছর বছর বেতন বৃদ্ধি বন্ধসহ আট দফা দাবিতে আন্দোলনে নামা বেসরকারি এম এইচ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *