Thursday , January 18 2018
Home / ঙ্ক্রাইম এক্সপ্রেস / দুই খলনায়কের ফাঁসি কবে

দুই খলনায়কের ফাঁসি কবে

নিজস্ব প্রতিবেদক;

আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। জাতির ইতিহাসে বেদনাদায়ক একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির সূর্যসন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ হত্যাকা-ে হানাদার বাহিনীর পাশাপাশি তাদের দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ে অংশ নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল জাতিকে মেধাশূন্য করা। এসব হত্যাকা-ের মাস্টারমাইন্ড ছিল চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের ঠিক দুদিন পরই পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।জাতি আজ বিনম্র শ্রদ্ধায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করবে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে যারা বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে এবং পলাতক আছে তাদের বিচারের আওতায় এনে রায় কার্যকর করা এখন জাতির প্রত্যাশা। ইতোমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর হয়েছে। বিদেশে পলাতক বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের দুই পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী গুপ্তঘাতক, আলবদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের দাবি শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্বজনদের।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যখন বুঝতে পারেন তাদের পরাজয় অনিবার্য হয়ে উঠেছে; তখন সুপরিকল্পিতভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা করে বেছে বেছে হত্যা করা শুরু করে। এ তালিকায় ছিল শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিকসহ আরও নানা পেশার সূর্যসন্তানরা। রাতের আঁধারে বাড়ি থেকে ধরে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। এর পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যার পর ঢাকার মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিসহ বিভিন্ন স্থানে লাশ ফেলে রাখে।১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের আগ মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অন্যতম দুই হোতা আল বদর বাহিনীর নেতা ছিলেন চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। তারা দুজন একাত্তর সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যা করেন। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যুদ- দেন। কিন্তু বিদেশে পলাতক থাকায় এখন পর্যন্ত মৃত্যুদ- কার্যকর করা যায়নি। স্বাধীনতার পর পরই চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান বিদেশে পালিয়ে যান। বর্তমানে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আছেন। গত কয়েক বছর ধরে তাদের দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। তাদের দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স কাজ করছে।শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘আমার পিতার হত্যাকা- এবং তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। আমার বাবার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কাছে বিজয়টা অসম্পূর্ণই থেকে যায়।’১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর চারদিকে যখন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের রব ওঠে, ঠিক তখনই ঘাতকচক্র মুনীর চৌধুরী, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ ভট্টাচার্য, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজুদ্দিন হোসেন, আবুল খায়ের, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, মনিরুজ্জামান, আনোয়ার পাশা, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, রশিদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, ডা. আলীম চৈৗধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি, নাজমুল হক, খন্দকার আবু তালেব, ডা. আমির উদ্দিন, সাইদুল হাসান প্রমুখ বুদ্ধিজীবীদের অপহরণের পর হত্যা করে। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও মো. কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। তারাও ছিলেন বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড।চৌধুরী মুঈনুদ্দীন বর্তমানে নর্থ লন্ডনের সাউথগেটে বসবাস করেন। তিনি প্রপার্টি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপের প্রতিষ্ঠাতা এবং মুসলিম এইডের সাবেক চেয়ারম্যান। জামায়াত ঘরানার আরও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ২০১৩ সালে অভিযুক্ত হওয়ার আগে জামায়াতভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের কাজে প্রকাশ্য দেখা গেলেও রায়ের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্য দেখা যায়নি।সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে প্রবাসী নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একাত্তরের খুনি চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে আন্দোলন। নাম দেওয়া হয়েছে ‘চৌধুরী মুঈনুদ্দীন এক্সট্রাডিশন ক্যাম্পেইন’। তাদের দাবি চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠিয়ে রায় কার্যকর করা। যদিও বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ব্রিটেনের এমপিদের মধ্যেও মতদ্বৈধতা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের এমপিদের একাংশ বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত। এ বিচার তারা মানেন। কিন্তু ফাঁসি মানবেন না। কারণ ব্রিটেনে ফাঁসির নিয়ম নেই। তবে তারা এ-ও বলেছেন, বাংলাদেশ তার আইনমতো অপরাধীকে শাস্তি দেবে এটাই স্বাভাবিক।অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থি কিছু এমপি রয়েছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান না। হাউস অব লর্ডসে আছেন কয়েকজন। কিছু এমপি এবং লর্ড জামায়াত এবং বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশে যোগ দেন।ব্রিটেন তথা ইউরোপীয় আদালতের আইন চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার বলেন, ব্রিটেনে প্রবেশের সময় যে কোনো ব্যক্তিকেই একটি আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হয় এবং সেখানে খুব সুস্পষ্টভাবে ওই ব্যক্তির অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড রয়েছে কিনা কিংবা কিছু সুনির্দিষ্ট অপরাধ যেমন গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদিতে সম্পৃক্ত রয়েছে কিনা কিংবা এসব উল্লিখিত ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে কিনা। এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের সরকারকে অবহিত করতে হয়। ১৯৭১ সালে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন একজন পলাতক ব্যক্তি হিসেবেই বাংলাদেশ সরকারের কাছে লিপিবদ্ধ ছিল। ওই অপরাধের ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল। যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করার সময় চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আবেদন ফর্মে কী তথ্য দিয়েছে এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকার তদন্ত করতে পারে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্রিটিশ সরকার চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে।শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। এ ছাড়া দিনব্যাপী স্মরণসভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে জাতি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও প্রার্থনা সভারও আয়োজন করা হয়।দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুদ্ধিজীবীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন।এদিকে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ’৭১, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী, খেলাঘরসহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

Check Also

শিক্ষার্থীদের খুলি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বছর বছর বেতন বৃদ্ধি বন্ধসহ আট দফা দাবিতে আন্দোলনে নামা বেসরকারি এম এইচ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *